সত্যসন্ধান : মুসা ইব্রাহীমের এভারেস্ট আরোহন

শেয়ালের কুমিরের ছানা দেখানোর মতো অবস্থা দেখা যাচ্ছে ফেসবুকে। একই জিনিস বারবার খন্ডনের পরেও ঘুরেফিরে আসছে। সমস্যা হচ্ছে আমরা বাঙালী, অন্যের কথায় চিলে কান নিয়ে গেছে বলে দৌড়াতে থাকি।

মুসা কি এভারেস্ট জয় করেছে? আমার মতো সারা পৃথিবীর অনেক মানুষও তা জানে না, কারন আমরা তখন তার সাথে ছিলাম না। কিন্তু সাথে না থাকা বা নিজের চোখে না দেখা মানে এই নয় যে সেটা সত্য নয়। কিন্তু কিভাবে সেটা প্রমান করা যায়?

প্রথমেই, ফেসবুক পোস্ট দেখে কিছু বিশ্বাস করবেন না, অন্ততপক্ষে যতোক্ষণ পর্যন্ত না সেই পোস্টে কোন বিশ্বাসযোগ্য রেফারেন্স আছে। তাই সত্য যাচাইয়ের প্রথম পর্ব হচ্ছে এমন একটা রেফারেন্স বা তথ্যসূত্র খুজে বের করা যেটা মুসা ইব্রাহীম দ্বারা প্রভাবিত নয় এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্র এই তথ্যসূত্রকে বিশ্বাস করে।

মুসার ধারাভাষ্যে পাওয়া যায় যে এভারেস্ট থেকে নামার পথে সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে এবং তখন অন্য এক অভিযাত্রী অক্সিজেন দিয়ে তাদেরকে উদ্ধার করে। তাই প্রথমেই খঁজে পাওয়া দরকার যে সেই মহামানবকে কোথাও পাওয়া যায় কি না। বেশ কিছু সার্চের পর ফলাফল পাওয়া গেলো গুগলে (scottish mountaineer saves bangladeshi journalist in everest), স্কটল্যান্ডের পত্রিকায় সেখানকার একজন বলেছে যে মুসাকে তারা পর্বতশীর্ষৈর ১৫০ মিটারের মধ্যে পেয়েছে। এটাতে প্রমাণ হয় না যে মুসা পর্বত আরোহন করেছে, কিন্তু এটা প্রমাণ করে যে মুসা পর্বতশীর্ষের কাছে গিয়ে অন্তত পৌছেছে।

এরপর খুঁজে দেখা দরকার যে কোন পর্বতশীর্ষে আরোহনের কোন তালিকা কোথাও আছে কি না। অফিসিয়াল লিস্ট দিয়ে সার্চ করলে বেশ কয়েকটি ওয়েবসাইটের তালিকা পাওয়া যায়। এর মধ্যে হিমালয়ান ডেটাবেজ বেশ কয়েকটি রিসার্চ পেপারে তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তাই তথ্যসূত্র হিসেবে এটাকে নির্ভরযোগ্য বলে গণ্য করা যায়। সেই ডেটাবেজে ২০১০ সালের স্প্রিং-এ মুসা ইব্রাহীমের নাম দেখা যাচ্ছে। এখন এটা শু্ধু একটা সূত্র, এবং এটার উপর নির্ভর করে থাকলে তো চলবে না। তাই আমাদের অন্ততপক্ষে আরেকটা তথ্যসূত্র দরকার যেখানে মুসার নাম তালিকায় অন্তর্ভূক্ত আছে।

আরো বেশ কিছু খোঁজ চালানোর পর 8000ers.com সাইটে (http://www.8000ers.com/cms/en/8000ers-mainmenu-205/52.html) আরেকটা লিস্ট পাওয়া গেলো (http://www.8000ers.com/cms/en/download.html?func=startdown&id=152)।

যারা চাঁদে সাইদীর মুখ দেখতে চান, তারা তাই দেখতে পান। কিন্তু যারা যুক্তবাদী তারা ব্যাপারটা একটু খতিয়ে দেখেন। তাই চিলে কান নিয়ে গেছে ভেবে চিলের পিছে ছুটে লাভ নেই, হাতটা কানের কাছে নিয়ে আগে দেখা দরকার যে কানটা আসলেই চিলে নিয়েছে কিনা।

তারপরেও যাদের সন্দেহ আছে, তাদের জন্য বলছি, যদি আপনাদের কাছে প্রমাণ থাকে, তাহলে নেপালের কর্তৃপক্ষের হাতে সেটা পৌছে দিন। গত বছর দুইজন ভারতীয় এভারেস্টে না উঠেও দাবি করেছিলেন যে তারা এভারেস্ট জয় করেছেন, কিন্তু পরে যখন প্রমাণিত হয়েছে তারা এভারেস্টের চুড়ায় উঠেননি, তখন তাদেরকে ১০ বছরের জন্য এভারেস্ট থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত করা হয়েছে। তাই গুজব না ছড়িয়ে যদি প্রমাণ থাকে তাহলে একটা সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করুন। আর যদি তা না থাকে, তাহলে দয়া করে সত্যকে বিকৃত করবেন না, সবার প্রতি বিনীত অনুরোধ রইলো।

References:

মন নিয়ন্ত্রণ

কথা বা অঙ্গভঙ্গি দিয়ে যন্ত্রপাতি নিয়ন্ত্রণ এখন অনেকটাই ডালভাত। কিছুদিনের মধ্যেই আমরা হয়তো গ্যাজেট নিয়ন্ত্রণ করবো আমাদের মন দিয়ে। আমরা শুধু মনে মনে হয়তো ভাববো যে টিভিটা চালু হয়ে যাক, আর সাথে সাথেই হয়তো টিভিটা ঠিকই নিজে নিজে চালু হয়ে যাবে। অথবা কোন চ্যানেলের কথা ভাবতেই হয়তো সেই চ্যানেলে বদলে যাবে টিভি। কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির দুই গবেষক মার্শেল জাস্ট এবং টিম মিচেল সেই পথে অনেকটাই এগিয়ে গেছেন।

তারা এমন একটি যন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন (এমআরআই) যেটা মনে মনে যা চিন্তা করা হচ্ছে সেটা ধরতে পারে। তাদের পরীক্ষায় যারা অংশ নিয়েছেন, তাদেরকে স্ক্রিনে ২০টি ছবি দেখানো হয়। তারপর অংশগ্রহনকারীদেরকে বলা হয় যে তাদেরকে যে ছবি দেখানো হবে, সেটার কোন গুণগত মান চিন্তা করতে। আর কম্পিউটার সেটা বের করার চেষ্টা করবে। পরীক্ষা থেকে দেখা গেছে কম্পিউটার অংশগ্রহনকারীদের মনের কথা ১০০ ভাগ ক্ষেত্রেই ঠিকভাবে বলে দিতে পারছে।

তাদের পরীক্ষায় দেখা যাচ্ছে যে, মানুষের ভাষা যাই হোক না কেন, বা কোন এক লোক যেভাবেই বেড়ে উঠুক না কেন, কোন কোন জিনিস আমরা যখন চিন্তা করি, তখন আমাদের সবার মস্তিষ্কের কিছু অংশ একইভাবে সাড়া দেয়। যেমন ধরা যাক, স্ট্রবেরির ক্ষেত্রে আমরা হয়তো ভাবতে পারি ‘লাল’, ‘খাব’ অথবা ‘এক হাতে ধরবো’ ইত্যাদি। মস্তিষ্কের কোন অংশটি কোন ধরনের কথা চিন্তা করার জন্য সাড়া দেয়, সেটা কম্পিউটারের খুব ভালো করে জানা আছে। কম্পিউটারটি এছাড়াও কোন সংখ্যাটি আপনি ভাবছেন অথবা ১৫টি আবেগের মধ্যে কোন আবেগের কথা আপনি ভাবছেন, সেটাও খুব সহজেই ধরতে পারে।

তবে এই প্রযুক্তি সর্বসাধারনের কাছে খুব শীঘ্রই পৌছাচ্ছে না, কারণ এর বাস্তবায়ন নিয়ে রয়েছে বেশ কিছু নৈতিক প্রশ্ন। এখনো পর্যন্ত এই প্রযুক্তির ব্যবহার মূলত প্রতিবন্ধীদের মনের কথা প্রকাশের সুবিধার জন্য বা আইন বিভাগের প্রয়োজনে মিথ্যা কথা সনাক্ত করার কাজে সীমাবদ্ধ থাকছে।

উৎস: সায়েন্টিফিক অ্যামেরিকান, ডিসেম্বর ২০১২

ডিজিটাল বিপদ

দিনে দিনে মাইক্রোচিপের আকার যেমন ছোট হয়ে আসছে, তেমনি বাড়ছে তাদের ক্ষমতা। আর এর আমাদের জীবনের প্রায় প্রতিটি মুহুর্তেই ব্যবহৃত হচ্ছে মাইক্রোচিপ। স্মার্টফোন, রেললাইনের সুইচ, পাওয়ার গ্রিড, পানিশোধনাগার, চিকিৎসার যন্ত্রপাতি কোথায় নেই এই মাইক্রোচিপ। সম্প্রতি কম্পিউটার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, এইসব এম্বেডেড কম্পিউটারগুলো নতুন এক ধরনের বিপদ ডেকে নিয়ে আসছে। কারণ, এই কম্পিউটারগুলো অন্য কম্পিউটারের সাথে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংযুক্ত, কিন্তু এদের ফার্মওয়্যারগুলোকে বাইরের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার কোন প্রতিরোধ ক্ষমতাই এদের নেই। গত অক্টোবরে নেটওয়ার্ক আক্রমণের একটা ঝড় বয়ে যাওয়ার পর অনেকেই ধারণা করছেন, এরচেয়ে অনেক বড় মাপের একটা বিপর্যয় খুব তাড়াতাড়িই ঘটতে পারে।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা ফার্মওয়্যারের প্রতিরক্ষার ব্যাপারে খুব একটা চিন্তা কখনোই করেন না। কারণ, সাধারণ প্রোগ্রামের থেকে এর মূল পার্থক্য হচ্ছে ফার্মওয়্যারগুলো কোনরকম পরিবর্তন ছাড়াই অনেকদিন ধরে চলার জন্য তৈরি করা হয়। কিন্তু এই ফার্মওয়্যারগুলোকেও বেশ কয়েকবার মুছে ফেলে আবার নতুন করে আপলোড করা যায়। আর এই দূর্বলতার সুযোগটাই নিতে যাচ্ছে অভিজ্ঞ সাইবার আক্রমণকারীরা। তারা এখন প্রথম আক্রমণে এই এম্বেডেড কম্পিউটারগুলোর ফার্মওয়্যার মুছে ফেলে সেখানে পরিবর্তিত ফার্মওয়্যার আপলোড করে নিচ্ছেন। ফলে সেই কম্পিউটারটা তাদের পুরো আয়ত্তে এসে যাচ্ছে।

এ ধরনের আক্রমণ ঠেকাতে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরাও বের করছেন নতুন কৌশল। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ডেভেলেপার অ্যাঙ কুই এবং সল স্টলফো সিম্বায়োটি নামে নতুন এক প্রোগ্রাম তৈরি করেছেন। এই প্রোগ্রামটি ফার্মওয়্যারের অংশবিশেষ র‍্যান্ডমলি পরীক্ষা করে দেখে যে এতে কোন ধরনের পরিবর্তণ ঘটেছে কি না। যে কোন ধরনের ফার্মওয়্যারের সাথে এই প্রোগ্রামটি কাজ করতে সক্ষম। আরো যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হচ্ছে, এই প্রোগ্রাম যোগ করার কারণে মূল কম্পিউটারটারের প্রসেসিং স্পিড স্লো হয়ে যায় না। এই প্রোগ্রামের ডেভেলপাররা আশা করছেন যে, এই প্রোগ্রাম হয়তো নতুন সব ম্যালওয়্যার সনাক্ত করতে পারবে, আর তার ফলে সাইবার যুদ্ধের ওপর অনেক কিছু জানার সুযোগ করে দেবে আমাদের।

উৎস: সায়েন্টিফিক অ্যামেরিকান, ডিসেম্বর ২০১২